শরিয়ত তো আছেই! তরিকায় বায়াত গ্রহণের প্রয়োজন কি? জেনে নিন ১০টি কারণ-
”তোমরা সত্যবাদির সাথি হ্ও” আল-কুরআন।
১. “আল্লাহ পরীক্ষা করেন শরীয়ত ও যথাযথ পথ নির্দেশ দ্বারা এবং সৎকর্মে প্রতিযোগিতার আদেশ দ্বারা।” -সূরা মায়েদা: ৪৮। [এখানে শরীয়ত থাকতেও আল্লাহ আরেকটি পথের কথা উল্লেখ করেছেন।] উক্ত আয়াতে পরীক্ষা করেন দ্বারা বলতে ধৈর্যের সীমা দেখেন। তিনি পরীক্ষা করেন ক্ষুধা ও ডর দ্বারা, ধন-সম্পদ, জীবন, স্ত্রী-সন্তান, ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দ্বারা। পরীক্ষায় যারা উর্ত্তীণ অর্থ্যাৎ যারা ধৈর্য ধারণ করে তারা প্রাপ্ত হয় বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত। - সূরা ২ বাকারা: আয়াত ১৫৫-১৫৭।
২. যারা আল্লাহ থেকে বিশেষ জ্ঞানপ্রাপ্ত এবং আমলকারী তারা ’আহলে-যেকের’। তাদের শরণাপন্ন হতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। দেখুন- সূরা ১৬ নাহল: আয়াত ৪৩ এবং সূরা আম্বিয়া ২১: আয়াত ৭।
৩. তরিকা বা বায়াত গ্রহণের একটি বৃহৎ উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ওলি হওয়া। “আল্লাহর ওলিদের কোন ভয় নাই, তারা দুঃখিতও হবে না- সূরা ১০ ইউনুস:৬২” যেমন- ডাক্তার হতে হলে ডাক্তারের সান্নিধ্যে থেকে প্র্যাক্টিস করতে হয় তেমনি ওলির শিক্ষা বা সান্নিধ্য ছাড়া কেউ কী কোন দিন ওলি হতে পেরেছে? এমন একজন ওলিআল্লাহও নাই এ পৃথিবীতে যিনি বায়াত না হয়ে ওলিআল্লাহ হয়েছেন।
৪. তরিকা বা বায়াত গ্রহণের আরো একটি উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সংবিধান আল কুরআন বুঝা এবং সে অনুযায়ী সঠিক আমল করা। বাংলাদেশে উয়ায়েছী তরিকার প্রর্বতক- শাহ্ আবদুর রহিম (রহ.) বলেছেন-
“বাপ দাদা, পীর, হাদী, ওস্তাদ, আলেম
কুরআন মতে কহে মানহ হাকেম।
বেমিল বাতায় যদি রদ করে দিবে
আপনা আকেল জোরে বুঝিয়া লইবে।
#একলা থাকিতে যদি হয় দুনিয়াতে
তবু না ছাড়িবে ফেল কুরআনের মতে।”
ইসলামে মূল কাজ হলো আল্লাহ প্রাপ্তির পথ পাওয়া বা মৌলিক তত্ব অনুশীলন। শরিয়তে আল্লাকে চেনা-জানার সুযোগ নেই। আল্লাহকে চেনা-জানার বিশেষ জ্ঞান আল্লাহ তাঁর রাছূল (ছা) এর মাধ্যমে বিশেষ মানুষদের শিক্ষা দিতেন বায়াতের মাধ্যমে। কুরানের ভাষ্যতেই- যাদের জ্ঞান দান করা হলো তাদের উত্তম সম্পদ দান করা হলো।
৫. দেখুন, পাক কুরআনে এবাদত করার একটি মেয়াদ দেয়া হয়েছে। ইবাদতের মেয়াদ হলো ইয়াকীন না আসা পর্যন্ত। সূরা হিজর: আয়াত নং ৯৯। কিসের ইয়াকীন তা অবগত হওয়ার জন্য সঠিক তরিকা প্রয়োজন, কামেল মুর্শেদ প্রয়োজন।
৬. যে আমানতের ভার আছমান, জমিন, পাহাড় বহন করতে অস্বীকার করেছে (সূরা ৩৩ আজহাব: ৭২)। ‘কিন্তু মানুষ উহা বহন করিল’ সেই আমানত পরিচিতি ও সেই আমানত হেফাজত পদ্ধতি জানার জন্য তরিকা প্রয়োজন সঠিক মুর্শিদ প্রয়োজন। আমানত ফেরতযোগ্য। আমানত না চিনলে কিভাবে হেফাজত হবে আর কিভাবে তা ফেরত দেয়া যাবে! সুতরাং আল্লাহ দেয়া আমানত চেনা, হেফাজত করা ও ফেরত দেয়ার জন্য সঠিক মুর্শিদের সান্নিধ্য প্রয়োজন।
৭. মানব শরীর যেমন বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা পরিপূর্ণ। তেমনি আল্লাহর রাসূলের দ্বীন বা তরিকার অঙ্গসমূহ হচ্ছে- শরিয়ত, তরিকত, মারেফত, হাকিকত। একটি ছাড়া অপরটি অচল। এক বুজুর্গ বলেছেন- যে শুধু শরিয়ত করলো সে জিন্দিক, যে শুধু তরিকত করলো সে ফাসেক, যে উভয়টি করলো সে কামেল।
৮. কুরআনে ৩ প্রকারের জিকির করার জন্য নির্দেশ দেয়া আছে তা সঠিকভাবে জানতে হবে ও জানার পর আমল করতে হবে; কুরআনে উল্লেখ করা জিকির ব্যতিত অন্যান্য অজিফা/জিকির কি কুরআন সম্মত? ৫০০/১০০০ বার অমুক কথা তমুক কথা পাঠ করা কুরআন সম্মত নয়। কুরআন অনুযায়ী তিন প্রকারের জিকির করার নির্দেশ। কুরআনে উল্লেখিত জিকির করেই আপনি সময় পাবেন না; দম কশি চিল্লা বসি শত শত বার অন্যান্য জিকির করার সময় কই! কুরআন অনুযায়ী তিন প্রকারের জিকির করার নির্দেশসমূহ দেখুন-
<১> আল্লাহর নামের জেকের করতে হুকুম- সূরা নং ৭৩: আয়াত নং ৮
<২>আল্লাহর নিয়ামতের জেকের করতে হুকুম- সূরা নং ৩৩: আয়াত নং ৯
<৩>আল্লাহর জেকের করতে হুকুম- সূরা নং ৩৩: আয়াত নং ৪১ ইসমে আজম বা সর্বচ্চো নাম, মূল নিয়ামত এবং খাস আল্লাহর জিকির (আল্লাহর নামের জিকির নয়) এগুলি জানার জন্য এবং সঠিকভাবে আমল করার জন্য তরিকা প্রয়োজন সঠিক মুর্শিদ প্রয়োজন।
৯. বহু আয়াতে বায়াত গ্রহণের নির্দেশ রয়েছে। যেমন- (ক) হে মুমেনগণ! আল্লাকে ভয় করে এবং তাঁর সান্নিধ্যের জন্য ওসিলা অন্বেষণ কর। সূরা ৫:৩৬ (খ) যদি তোমরা না জান তাহলে আহলে যেকেরকে জিজ্ঞাসা কর। সূরা ১৬:৪৩ (গ) নিশ্চয়ই যারা আপনার হাতে বাইয়াত করে, তারা আল্লারই হাতে বাইয়াত করে। তাদের হাতের উপর আল্লাহর হাত। সূরা ৪৮:১০। (ঘ) নিশ্চয়ই আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের নিকট থেকে তাদের নফছ এবং মালামাল ক্রয় করেন। সূরা ৯:১১১। (ঙ) মানুষের মধ্যে এমনও আছে যে আল্লার সন্তুষ্টির অন্বেষায় তার নফছ বিক্রয় করে। সূরা ২:২০৭। (চ) হে মুমিনগণ!- আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের, আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যেকার উলিল আমরের (ইসলামের দিক নিদের্শনায় হুকুমের অধিকারী)। সূরা ৪:৫৯।
১০. কুরআনেই আছে যে, “হে ইমানদারগণ! মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করোনা।” এখানে অন্য ধর্মের বা মুসলিম বাপ-দাদার ঘরে জন্ম নিয়েছে তাদের নির্দেশ দেয়া হয় নাই। যারা ঈমানদার মুসলিম তাদের আল্লাহ সম্বোধণ করেছেন ‘হে ঈমানদারগণ!’ বলে । তারপর বলেন মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। সহজ কথায়- ঈমানদারদের তরিকা/বায়াত গ্রহণ করে মুর্শিদের সহজ তালিম অনুযায়ী কুরআন বুঝে আমল করে মুসলিম হওয়ার ঈশারা। ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল সংশোধণ করবেন। তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। সূরা ৩৩:৭০-৭১। এক বুজুর্গ ওলি সুন্দর বলেছেন-
∴ ∴ ∴ শরিয়ত হলো ফুল, তরিকাহ তার সুভাস ∴ ∴ ∴
∴ ∴ শরিয়ত বাগান, তরিকাহ বায়ু প্রবাহ ∴ ∴
বাংলাদেশে উয়ায়েছী তরিকার প্রর্বতক- শাহ্ আবদুর রহিম উয়ায়েছী (রহ) তাঁর ‘মুহম্মদী বেদ তত্ত্ব’ গ্রন্থে লিখেছেন :
“যত কিছু যাহেরাত সেহি সব শরিয়ত
সে সবার ফেলকে তো তরীকত কয়।
মূল চিজ হাকিকত, ইয়াদেতে অবিরত
মারেফত সে ছুরাত চিনিব যাহায়।”
(এখানে শরিয়ত, তরীকত, হাকিকত, মারেফত বুঝার ইঙ্গিত) - রাসূল-নবী আর আসবে না। নবী-রাছূল পরর্বতী আহল, তাদের থেকে পীর-মুরশেদ, শায়খ-মাশায়েখ, ওলি-দরবেশ, গাওছ-কুত্বু, গুরু-সাঁই ইত্যাদি লকবে আখ্যায়িত। তাদের অনুসারীদের বলা হয় তালেব, খাদেম, মুরীদ, শিষ্য, ছাত্র ইত্যাদি। উল্লেখ যে, অনেক পন্ডিত, ওলী-দরবেশ নামের লোকও আছে যারা অবৈধভাবে মানুষের মালামাল ভোগ করে এবং লোকদেরকে আল্লাহর পথ থেকেই ফিরিয়ে রাখে। সূরা তওবাহ ৯ : আয়াত নং ৩৪।। এদের উদাহরণ দিয়ে কামেল মুর্শিদের শিক্ষা গ্রহণ না করা অজ্ঞতা ও বোকামী। এমতাবস্থায় শরিয়ত সব নিয়মসহ শরিয়াতকে আর শক্তিশালী করাতে চাইলে শরিয়াত সংযোগে তরিকাহ গ্রহণ করতে- পীর সাহেবের কাছে সরাসরি হাতে হাতে বাইয়াত হতে হয়। যার কাছে বাইয়াত হবেন সে আপনার পীর/মুর্শিদ বা শিক্ষক। তিনি পাক কুরআন সম্মত মারফত শিক্ষা দিবেন। শিক্ষা দিবেন এমন কিছু যা সে জানতো না। তিনি শিক্ষা দিবেন কিছু জটিল প্রশ্ন যেমন-
# আল্লাহর স্মরণ বা জিকির কি ও কিভাবে?
# আমানত কি এবং হেফাজত পদ্ধতি কি?
# সুরা হিজরের ৯৯ নং আয়াতে এবাদতের একটি মেয়াদ বলা হয়েছে সেই এবাদতের মেয়াদ কিসের উপর?
#সূরা আর রহমানে দুই পূর্ব দুই পশ্চিম (রাব্বুল মাসরিকাইন ওয়া রাব্বুল মাগরিবাইন) কোথায়?
# বেহেস্ত-দোজখ সম্পর্কে, সঠিক কুরআন হতে শিক্ষা।
# মাকামে মাহমুদ- কি ও কিভাবে অর্জন করতে হয়।
# বরজখ সম্পর্কে, সঠিক কুরআন হতে শিক্ষা।
# পুলসিরাত সর্ম্পকে বাস্তব আলোচনা।
# সুলতান নাছির, কাবা কাউছান, মারাজাল বাহরাইন, নফস, রুহ ইত্যাদি কুরআনিক কথার সঠিক বাস্তবসম্মত শিক্ষা দিবেন।
অনেকে বিভিন্ন তরিকায় শুধু বাইয়াত হয়ে বছরের পর বছর পার করে দিয়েছেন একটি বিশ্বাস সহকারে। বিশ্বাস ও আমল ছাড়া বছরের পর বছর পার করলে চলবে না; সঠিক শিক্ষা অর্জন করে আমল করতে হবে। যেহেতু আল্লাহ বলেন- একের বোঝা অন্যে বহন করবে না। কাজেই, নিজের বোঝা নিজেকেই বহন করতে হবে। সঠিক শিক্ষা অর্জনে প্রয়োজনে মুর্শিদ পরিবর্তন করতে হবে। মুর্শি দ পরিবর্তন করা হলেও আগের মুর্শিদের প্রতি তাজিম-শ্রদ্ধার যেন কমতি না হয়। তবেই উভয় কালে শান্তি প্রাপ্ত হওয়া যায় এবং আল্লাহর ওলি হওয়ার যায়। পরিশেষে, দোয়া হোক- হে আল্লাহ- ”আমারদের সহজ পথ দেখাও; যারা তোমার নেয়ামতপ্রাপ্ত তাদের পথ। তাদের পথে নয় যাদের প্রতি তুমি রাগান্বিত বা যারা গজব প্রাপ্ত (সূরা ফাতেহা)”। আমিন।
শাহ্ আশেক মুর্শেদ উয়ায়েছী (সুজন )
পীর
কালিয়াকৈর উয়ায়েছী পাক দরবার,
“দরবার-এ-শাহ্ আফাজ”
কালিয়াকৈর বাইপাস, কালিয়াকৈর পৌরসভা, গাজীপুর।
017206.02222