Monday, April 13, 2020

ইসলামের ইতিহাসে হযরত আলী (আঃ)এর প্রাধান্যের কারণ

হযরত আলী (কঃ) হচ্ছেন পাক পাঞ্জাতানের একজন। তাঁর জন্ম পবিত্র কাবা ঘরে, প্রথম দর্শন রাসূল (সাঃ) এর মুখ । প্রথম খাদ্য রাসূল (সাঃ) এর রসনা (থুথু)। তিনি সর্বদা রাসূল (সাঃ) এর সাথে ছিলেন। ১০ বৎসর বয়সেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বিশ্বের প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীর মর্যাদা লাভ করেন। রাসূলের (সাঃ) সহযোগী সার্বক্ষনিক দেহ-রক্ষক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তিনি রাসূলের (সাঃ) পরিবারে লালিত-পালিত হন এবং রাসূলের (সাঃ) পরিবারের সদস্য ছিলেন। তার মর্যাদা সম্পর্কে বিশ্ব নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) বলেছেনঃ-
  • আমি জ্ঞানের শহর, আলী তাহার দরজা।
  • আমি হেকমত বিদ্যার ঘর আলী তার দ্বার।
  • কোন মোনাফেক আলীকে ভালবাসে না, কোন মুমিন আলীকে ঘৃনা করেন না।
  • যে ব্যক্তি আলীকে গালী দেয়, সে আমাকে গালী দেয়; যে আমাকে গালী দেয়, সে আল্লাহকে গালী দেয়
আরো অনেক হাদিস রয়েছে আলী (আঃ) সম্পর্কে যা পাঠকগণ বিভিন্ন হাদিস কিতাব হতে সংগ্রহ করতে পারেন অথবা আমাদের মেইল করতে পারেন।
আল্লাহ হযরত আলীকে একজন মহাবীর “শের-এ-খোদা” এবং আদর্শ মানুষ হিসেব সৃষ্টি করেছেন। কারো কারো মতে কুরআনে হযরত আলী (আঃ) সম্পর্কিত ৩০০ আয়াত নাজেল হয়েছে। যেমন-
“হে ইমানদারগণ! আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে উলিল আমর (যারা কর্তৃত্বশীল) তাদের।” ৪:৫৯।
“হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল তোমাদের নিকট থেকে অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান” ৩৩:৩৩।
“ওহে রাসূল! আনপার প্রতিপালকে পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা পরিপূর্ণরূপে মানুষের কাছে পেৌছে দিন। যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তার দেয়া নবুওয়াতির দায়িত্বের কিছুই পালন করলেন না।” ৫:৬৭ ।
হযরত আলী (আঃ)কে প্রশংসা করতে গিয়ে তাঁর সকল মানব কল্যাণকর গুনাবলী, আল্লাহ এবং রাসূলের প্রতি প্রেম মূল্যায়ন করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁকে প্রথম হিসেব ধরা হয়েছে:-

তিনি রাসূল (সাঃ) এর পর ওয়ান Number ONE
  1. তিনিই প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি যিনি কাবা ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন।
  2. তিনিই প্রথম (রাসূলের (সাঃ) পর) নামায প্রতিষ্ঠা করেছেন।
  3. তিনিই প্রথম রাসূলের (সাঃ) অনুগত্য স্বীকার করছেন।
  4. তিনিই প্রথম নিজেকে জিহাদের জন্য সমর্পণ করেছেন।
  5. তিনিই প্রথম রাসূল (সাঃ) প্রতিষ্ঠিত ধর্মের বানী লাভ করেছেন।
  6. তিনিই প্রথম মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন সংকলন করেছেন।
  7. তিনিই প্রথম হিজরতের রাতে রাসূলের (সাঃ) বিছানায় মৃত্যুর ঝুকি নিয়ে ঘুমায়েছেন।
  8. তিনিই প্রথম, রাসূলের (সাঃ) অনুপস্থিতিতে সকল যুদ্ধের কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছিলেন।
  9. তিনিই প্রথম যাকে রাসূল (সাঃ) ‍ “দ্বিতীয় হারুন” উপাধি দিয়েছিলেন।
  10. তিনিই প্রথম রাসূল (সাঃ) এর উত্তরাধিকারী মনোনয়ন পেয়েয়েন।
  11. তিনিই প্রথম যাকে রাসূল (সাঃ) ‘মাওলা’ হিসেবে অভিষিক্ত করেছেন।
হযরত উমর (রা) হযরত আলী (আঃ) সম্পর্কে বলেছিলেনঃ আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ফয়সালাকারী আলী (রা)এমনকি রাসুল (সা) বলেছেনঃ আকদাহুম আলী তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিচারক আলীতাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত লক্ষ্য করে হযরত উমর একাধিকবার বলেছেনঃ লাওলা আলী লাহালাকা উমার অর্থাৎ আলী না হলে উমর ধংব্ব হয়ে যেত।
সর্বপরি আল্লাহ তায়ালা আলী (আঃ) এত বিবেক বুদ্ধি দিয়েছিলেন যে, তা যদি বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যে বিতরন করা যেতো তাহলে সকল নির্বোধ এবং বোকারা বুদ্ধিমান হয়ে যেত। তাঁর বুদ্ধির অসংখ্য প্রসংশা আরো আছে। চক্রান্তকারীগণ তাঁর প্রশংসা ছাপিয়ে রেখেছে ঈর্ষায়। তারপরো তাঁর যতটুকু আমরা জানতে পেরেছি। ততটুকু বর্তমান নামধারী মুফতী-মাওলানারা প্রচার করছেন কী না তা ভাবার বিষয়। প্রাইয় লক্ষ করলে দেখা যায়- বাংলাদেশের বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে অন্যান্য সাহাবীদের যেভাবে প্রসংশা করা হয় তার কিঞ্চিৎ পরিমানও আলী (আঃ) প্রশংসা করা হয় কি? বর্তমান যামানার উচ্চ পর্যায়ের ইসলামী কবি এবং চিন্তাবিদ আল্লামা ইকবাল আলী (আঃ) এর প্রশংসা করেন বলে কেউ তাকে প্রশ্ন করেছিল- আপনি এত আলী (আঃ) প্রসংশা করেন কেন? আপনি কি শিয়া হয়ে গেছেন? তখন আল্লামা ইকবাল বলেছেন- তাঁর প্রশংসা আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ) করছেন। আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) যদি শিয়া হয়ে থাকে তাহলে আমিও শিয়া।



পবিত্র কুরআনে হযরত আলী (রাঃ)-এর মর্যাদা
হযরত আলী(রাঃ) শানে পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াত নাযিল হয়েছে। ইবনে আসাকির হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কোন ব্যক্তির গুণ বর্ণনায় এত অধিক কুরআনের বাণী অবতীর্ণ হয়নি যা হযরত আলী সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস আরও বলেছেন যে,হযরত আলীর শানে তিনশ’ আয়াত নাযিল হয়েছে এবং তাঁর গুণাবলি অত্যধিক ও প্রসিদ্ধ। পবিত্র কুরআনের নাযিলকৃত আয়াতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হল :
১. সূরা বাকারার ২০৭ নং আয়াত
‘এবং মানুষের মধ্যে এমনও আছে,যে আল্লাহর সন্তোষ লাভের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বিক্রয় করে দেয় এবং আল্লাহ (এরূপ) বান্দাদের প্রতি অতিশয় অনুগ্রহশীল।’
সালাবী তাঁর তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে,রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার প্রস্তুতি নিলেন সেই সময় হযরত আলীকে তাঁর বিছানায় শুয়ে থাকার নির্দেশ দেন যাতে কাফির-মুশরিকরা মনে করে যে,রাসূল রয়েছেন। আলী (আ.) নির্দ্বিধায় এ নির্দেশ পালন করলে মহান আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন।তাঁর নিজ ঘরেই
২. সূরা আলে ইমরানের ৬১ নং আয়াত
‘অতঃপর তোমার নিকট যখন জ্ঞান (কুরআন) এসে গেছে, এরপরও যদি কেউ (খ্রিস্টান) তোমার সাথে তার (ঈসার) সম্বন্ধে তর্ক-বিতর্ক করে, তবে বল,‘(ময়দানে) এস,আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদের ও তোমাদের পুত্রদের,আমাদের নারীদের ও তোমাদের নারীদের এবং আমাদের সত্তাদের ও তোমাদের সত্তাদের;’ অতঃপর সকলে মিলে (আল্লাহর দরবারে) নিবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষণ করি।’
ঘটনাটি এরূপ : রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নবুওয়াতের সত্যতা যাচাই করার জন্য নাজরানের একটি খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল মদীনায় আসল। তাদের সাথে আলোচনা ফলপ্রসূ হলো না। রাসূল (সা.) হযরত ঈসা (আ.) সম্বন্ধে প্রতিনিধিদের বললেন যে,তিনি আল্লাহর পুত্র নন,বরং আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। রাসূলুল্লাহ্ হযরত ঈসার জন্মের ব্যাপারে হযরত আদমের উদাহরণও দিলেন। কিন্তু তারা কোন কথাই শুনল না। অবশেষে তিনি আল্লাহর আদেশে পরস্পরের বিরুদ্ধে দোয়া ও মিথ্যাবাদীদের ওপর অভিশাপ বর্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন,যাকে ‘মুবাহিলা’ বলে। স্থির করা হল যে,নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে উভয়ে নিজ নিজ পুত্রদের,নারীদের (কন্যা সন্তানদের) এবং তাদের নিজেদের ‘সত্তা’ বলে গণ্য হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একত্র হবে এবং প্রত্যেকে অপরের প্রতি অভিসম্পাত ও আল্লাহর শাস্তি কামনা করবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইমাম হুসাইনকে কোলে নিয়ে ইমাম হাসানের হাত ধরলেন এবং হযরত ফাতিমাকে নিজের পেছনে,আর হযরত আলীকে তাঁর পেছনে রাখলেন। অর্থাৎ ছেলেদের স্থানে তিনি নাতিদের,নারীদের স্থানে নিজ কন্যাকে এবং ‘সত্তা’ বলে গণ্যদের স্থানে আলীকে নিলেন এবং দোয়া করলেন,‘হে আল্লাহ! প্রত্যেক নবীর আহলে বাইত থাকে,এরা আমার আহলে বাইত। এদের সকল দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত ও পাক-পবিত্র রেখ।’ তিনি এভাবে ময়দানে পৌঁছলে খ্রিস্টানদের নেতা আকব তা দেখে বলল,‘আল্লাহর কসম, আমি এমন নূরানী চেহারা দেখছি যে,যদি এ পাহাড়কে নিজ স্থান হতে সরে যেতে বলেন,তবে অবশ্যই সরে যাবে। সুতরাং মুবাহিলা হতে হাত গুটিয়ে নেওয়াই কল্যাণকর,অন্যথায় কিয়ামত অবধি খ্রিস্টানদের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।’ পরিশেষে তারা জিযিরা কর দিতে সম্মত হল। এটা হযরত আলীর একটি উঁচু স্তরের ফযিলত যে,তিনি আল্লাহর আদেশে রাসূলের ‘নাফ্স’ (অনুরূপ সত্তা) সাব্যস্ত হলেন এবং সমুদয় নবীর থেকে শ্রেষ্ঠ হলেন।
৩. সূরা নিসার ৫৯ নং আয়াত
‘হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূল ও তোমাদের মধ্যে যারা নির্দেশের অধিকর্তা, তাদের আনুগত্য কর...।’
ইমাম জাফর সাদিক (আ.)- কে জিজ্ঞেস করা হলো যে,উত্তরাধিকারীর আদেশ মান্য করা কি অবশ্যই কর্তব্য? তিনি বললেন : হ্যাঁ,তাঁরা ঐসব ব্যক্তি যাঁদের আদেশ পালন করা এ আয়াতে ওয়াজিব করা হয়েছে...। এ আয়াত হযরত আলী বিন আবি তালিব,হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (আ.)-এর শানে অবতীর্ণ হয়েছে।
৪. সূরা মায়েদার ৫৫ নং আয়াত
‘(হে বিশ্বাসিগণ!) তোমাদের অভিভাবক তো কেবল আল্লাহ,তাঁর রাসূল এবং সেই বিশ্বাসীরা যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং রুকু অবস্থায় যাকাত প্রদান করে।’
শীয়া-সুন্নি উভয় মাযহাবের তফসীরকাররা একমত যে,আয়াতটি হযরত আলী (আ.)-এর শানে নাযিল হয়েছে। যেমন ইবনে মারদুইয়া এবং খাতীব বাগদাদী ইবনে আব্বাস সূত্রে এবং তাবরানী ও ইবনে মারদুইয়া আম্মার ইবনে ইয়াসির ও আলী ইবনে আবি তালিব সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে,আয়াতটি আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে যখন তিনি রুকু অবস্থায় যাকাত দেন।
ঘটনাটি এরূপ : একদিন হযরত আলী (আ.) মদীনার মসজিদে নামায পড়ছিলেন। এমন সময় একজন ভিক্ষুক এসে ভিক্ষা চাইল। কিন্তু কোন ভিক্ষা না পাওয়ায় সে ফরিয়াদ করল যে,রাসূলের মসজিদ থেকে সে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে। এ সময় হযরত আলী রুকু অবস্থায় ছিলেন। তিনি সেই অবস্থায় তাঁর ডান হাতের আঙ্গুল থেকে আংটি খুলে নেওয়ার জন্য ভিক্ষুকের প্রতি ইশারা করেন। ভিক্ষুক তাঁর হাত থেকে আংটি খুলে নেয়। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে উপরিউক্ত আয়াত নাযিল হয়।
৫. সূরা মায়েদার ৬৭ নং আয়াত
‘হে রাসূল! যা (যে আদেশ) তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে তা পৌঁছে দাও,আর যদি তুমি তা না কর,তবে তুমি (যেন) তার কোন বার্তাই পৌঁছাওনি,এবং (তুমি ভয় কর না) আল্লাহ তোমাকে মানুষের অনিষ্ট হতে রক্ষা করবেন;এবং নিশ্চয় আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সঠিক পথে পরিচালিত করেন না।’
যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) দশম হিজরিতে বিদায় হজ্ব থেকে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করছিলেন সে সময় আল্লাহ্ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন। ইবনে আবী হাতিম ও ইবনে আসাকির আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণনা করেছেন যে,এ আয়াত গাদীরে খুম প্রান্তরে হযরত আলী (আ.)-এর শানে নাযিল হয়েছে।
বিদায় হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তন করার সময় গাদীরে খুম নামক স্থানে মহানবী (সা.) হযরত আলীকে তাঁর পরে সকল মুমিনের অভিভাবক বলে ঘোষণা দেন।
এ ঘোষণা দেয়ার পর হযরত ওমর হযরত আলীর সাথে সাক্ষাৎ করে অভিনন্দন জানান এবং বলেন : ‘হে আলী ইবনে আবি তালিব! আপনি আজ হতে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর মাওলা হয়ে গেলেন।’
৬. সূরা রাদের ৭ নং আয়াত
‘(হে রাসূল!) তুমি তো কেবল সতর্ককারী এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে এক পথ প্রদর্শক।’
ইবনে মারদুইয়্যা,ইবনে জারীর,আবু নাঈম তাঁর ‘মারেফাত’ গ্রন্থে,ইবনে আসাকির,দাইলামী ও ইবনে নাজ্জার তাঁদের স্ব স্ব গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে,আয়াতটি নাযিল হলে মহানবী (সা.) তাঁর হাত নিজের বুকে রেখে বললেন,‘আমিই সতর্ককারী।’ অতঃপর আলীর কাঁধের প্রতি তাঁর হাত দ্বারা ইশারা করে বললেন,‘হে আলী! তুমিই পথপ্রদর্শক এবং মানুষ আমার পর তোমার মাধ্যমে হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে।’ উক্ত রেওয়ায়েতটি শব্দের তারতম্যে ইবনে মারদুইয়্যা সাহাবী আবু বারযাহ আসলামী হতে,জীয়াফীল হযরত ইবনে আব্বাস হতে,ইবনে আহমাদ তাঁর মুসনাদে এবং ইবনে মারদুইয়্যা ও ইবনে আসাকির স্বয়ং হযরত আলী (আ.) হতে বর্ণনা করেছেন।
৭. সূরা রাদের ৪৩ নং আয়াত
যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলে,‘তুমি আল্লাহর রাসূল নও।’ তুমি বল,‘আমার ও তোমাদের মধ্যে (রেসালাতের) সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং সেই ব্যক্তি যার কাছে গ্রন্থের পূর্ণ জ্ঞান রয়েছে।’
অধিকাংশ তাফসীরকার স্বীকার করেছেন যে,আয়াতে বর্ণিত সেই ব্যক্তি হলেন হযরত আলী(আ.)। যেমন আসমী ‘যায়নুল ফাতা’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং সা’লাবী আবদুল্লাহ ইবনে আতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে,আবদুল্লাহ বিন সালাম বলতেন,‘যার কাছে গ্রন্থের পূর্ণ জ্ঞান আছে’-এর উদ্দিষ্ট হযরত আলী (আ.)। এজন্যই হযরত আলী (আ.) বারবার বলতেন,‘আমার কাছে আমার মৃত্যুর পূর্বে যা চাও জিজ্ঞেস কর।’
৮. সূরা নাহলের ৪৩ নং আয়াত
তোমার পূর্বেও আমরা কেবল পুরুষদেরই (রাসূল করে) প্রেরণ করেছি যাদের প্রতি আমরা প্রত্যাদেশ প্রেরণ করতাম;যদি তোমরা না জেনে থাক তবে যারা জানে তাদের জিজ্ঞেস কর।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন : জ্ঞানী ব্যক্তিরা অর্থাৎ আহলুয যিকর হলেন হযরত মুহাম্মাদ (সা.),হযরত আলী (আ.),হযরত ফাতেমা (আ.),হযরত হাসান ও হুসাইন (আ.)। যাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলেছেন : যখন এই আয়াত নাযিল হল তখন হযরত আলী বললেন : আমরাই হলাম জ্ঞানের ভাণ্ডার।
৯. সূরা আহযাবের ৩৩ নং আয়াত
‘হে নবী পরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।’
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামার ঘরে এ আয়াত নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত ফাতিমা,ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-কে ডাকেন এবং তাঁদেরকে একটি চাদরে ঢেকে নেন। হযরত আলী তাঁর পেছনে ছিলেন। তিনি তাঁকেও চাদরে ঢেকে নেন। অতঃপর বলেন : ‘হে আল্লাহ্! এরা আমার আহলে বাইত। অতএব,তুমি তাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করে দাও এবং তাদেরকে উত্তমরূপে পবিত্র কর।’ তখন উম্মে সালামা বলেন : ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমিও কি তাদের অন্তর্ভুক্ত?’ তিনি বলেন : ‘তুমি স্ব স্থানে আছ এবং তুমি কল্যাণের মধ্যেই আছ।’
হযরত উম্মে সালামা ছাড়াও হযরত আবু সাঈদ খুদরী ও আনাস ইবনে মালিক কর্তৃক এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।
১০. সূরা শূরার ২৩ নং আয়াত
‘বল,আমি এর বিনিময়ে তোমাদের নিকট থেকে আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা ছাড়া আর কোন প্রতিদান চাই না।’
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকটাত্মীয় আহলে বাইতের সদস্যদের প্রতি ভালবাসা পোষণকে এ আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ মুসলমানদের জন্য ফরয বলে ঘোষণা করেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন : যখন এ আয়াত নাযিল হল তখন সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন,হে রাসূলুল্লাহ! আপনার নিকটাত্মীয়,যাদেরকে ভালবাসা আমাদের ওপর ওয়াজিব করা হয়েছে তারা কারা? রাসূল (সা.) বললেন : আলী,ফাতেমা,হাসান ও হুসাইন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসে আলী (রাঃ)
হযরত আলীর মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর নিকট থেকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হল :
১. সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বলেন,নবী (সা.) তাবুক যুদ্ধের সময় আলীকে লক্ষ্য করে বলেছেন : ‘তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে,মর্যাদার দিক থেকে মূসার নিকট হারুন যে পর্যায়ে ছিলেন, তুমিও আমার নিকট ঐ পর্যায়ে রয়েছ?’
২. অন্য একটি হাদীসে এসেছে : রাসূল বলেন : ‘তুমি তো আমার নিকট তদ্রূপ যেরূপ হারুনের স্থান মূসার নিকট। পার্থক্য এতটুকু যে, আমার পরে কোন নবী নেই।’
৩. রাসূলুল্লাহ (সা.) ইমাম হাসান ও হুসাইনের হাত ধরে বলেন : ‘যে ব্যক্তি আমাকে ভালবাসে এবং এ দু’জন ও তাদের পিতা-মাতাকে ভালবাসে,সে কিয়ামতের দিন আমার সাথে একই মর্যাদায় অবস্থান করবে।’
৪. আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেছেন : ‘আলীর চেহারার দিকে তাকানোও ইবাদত।’
৫. রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আলী (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছিলেন : ‘মুমিনরাই তোমাকে মহব্বত করবে এবং মুনাফিকরাই তোমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে।’
৬. তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাযাহ হুবশী ইবনে জুনাদাহ্ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সা.) বলেছেন : ‘আলী আমা থেকে এবং আমি আলী থেকে। যে ব্যক্তি আলীকে ভালবেসেছে, সে আমাকে ভালোবেসেছে। আর যে ব্যক্তি আলীকে ভালবেসেছে,সে আল্লাহকে ভালবেসেছে। যে ব্যক্তি আলীর সাথে শত্রুতা পোষণ করেছে সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করেছে। আর যে আমার শত্রু সে আল্লাহর শত্রু। যে ব্যক্তি আলীকে কষ্ট দিয়েছে,সে আমাকে কষ্ট দিয়েছে।’
৭. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন : ‘(হে আলী!) দুনিয়া ও আখেরাতে তুমি আমারই ভাই।’
৮. আবদুল্লাহ ইবনে বুরাইদা (র.) থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘চার ব্যক্তিকে ভালবাসতে আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন এবং তিনি আমাকে এও অবহিত করেছেন যে, তিনিও তাদের ভালবাসেন। বলা হল : হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের তাদের নামগুলো বলুন। তিনি বলেন : আলীও তাদের অন্তর্ভুক্ত। এ কথা তিনি তিনবার বলেন। (অবশিষ্ট তিনজন হলেন) আবু যার, মিকদাদ ও সালমান।...’
৯. জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : তায়েফ অভিযানের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) আলীকে কাছে ডেকে তার সাথে চুপিসারে আলাপ করেন। লোকেরা বলল : তিনি তাঁর চাচাত ভাইয়ের সাথে দীর্ঘক্ষণ চুপিসারে কথা বললেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন : আমি তার সাথে চুপিসারে কথা বলিনি;বরং আল্লাহই তার সাথে চুপিসারে কথা বলেছেন। (অর্থাৎ তার সাথে চুপিসারে কথা বলার জন্য আল্লাহ্ই আমাকে আদেশ করেছেন।)
হযরত আলী সম্পর্কে অন্যান্য সাহাবী
হযরত আবু বকর প্রায়ই হয়রত আলীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। হযরত আয়েশা এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন : ‘আমি রাসূলে করীমকে বলতে শুনেছি,আলীর মুখ দেখা ইবাদাতের শামিল।’
হযরত উমর বিন খাত্তাব বলতেন,হযরত আলী বিন আবি তালিবের তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিল। যদি তার একটি আমার থাকত তাহলে আমি বলতাম যে,আমাকে লাল রঙের একটি উট দেয়া হলে তা অপেক্ষাও আমি তা পছন্দ করতাম। তাঁকে এ তিনটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন : ১.তাঁর বিয়ে হয় রাসূল (সা.)-এর কন্যার সাথে,২. তাঁর সঙ্গে রাসূলে করীমের মসজিদে অবস্থান এবং যা রাসূলে করিমের জন্য বৈধ ছিল তার জন্যও তা বৈধ ছিল এবং ৩. খায়বার যুদ্ধের পতাকা বহনের দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল।
হযরত উমর বলেছেন, হে আল্লাহ! আমার ওপর এমন কোন বিপদ দিও না যখন আবুল হাসান (আলী) আমার নিকট উপস্থিত না থাকে। কারণ,তিনি আমার নিকট উপস্থিত থাকলে আমাকে সে বিপদ থেকে নিষ্কৃতি দেবেন।’
তাবরানী হযরত ইবনে আব্বাস থেকে রেওয়ায়াত করেছেন যে,হযরত আলীর আঠারটি বৈশিষ্ট্য এমন ছিল যা সমগ্র উম্মতের কারও ছিল না।’

বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (ছা.) ও তাঁর আহলে বায়েত বইটি প্রত্যেক রাসূল অনুসারী ও অনুসন্ধিৎসা পাঠকদের জন্য ..

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম রাসূল (ছা.) জীবনি সম্পর্কে স্বচ্ছ ও সত্য জ্ঞানার্জনে বইটিতে যা যা পাবেন তা সংক্ষেপে নিন্ম: হযরত মু...