তন ও মন পবিত্রকরণ সিয়াম সাধনের তাকওয়া
ফকির শাহ্ আশেক মোরশেদ উয়ায়েছী (সুজন), ০১৭২০৬০২২২২
রমজানের এক মাস রোজা একটি রিফ্রেশিং ট্রেনিং।
এর মাধ্যমে শিক্ষা নিতে হয় কিভাবে অন্য মাসগুলোতেও বা সারা বছর বিরত থাকতে হয় অবৈধ
চিন্তা ও অবৈধ কাজ থেকে। কুপ্রবৃত্তির (নফস) ওপর নিয়ন্ত্রণ করে একমাত্র রোজা। ইসলামের
পাঁচটি খুঁঁটিই মজবুত করতে হয়। তবেতো ইসলাম নামক ঘরটি মজবুত হবে। শুধু ৫ ওয়াক্ত নামাজের
একটি খুঁটি মজবুত করলে হয় না। প্রকৃত ঈমানদারদের প্রতিটি খুঁটিই মজবুত করা উচিত। জন্ম
থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রোজা পালনই রমজান মাসের শিক্ষা। এখানেই সিয়ামের আধ্যাত্মিকতা
(ঝঢ়রৎরঃঁধষরঃু)। এ শিক্ষা/সাধনা নফসে আম্মারার (কুপ্রবৃত্তি) বিরোদ্ধে। কুফরি, শেরেকি,
জেনা, মিথ্যা এগুলি পবিত্রতা অর্জনে বাধা ও অশান্তির পথ। এগুলি হতে ফিরে থাকা মানুষের
সারা জীবনের রোজা। রোজার পুরস্কার যেহেতু আল্লাহ নিজে দেন তাই এ পুরস্কার অর্জন করা
আমাদের তাকওয়া বা পরহেজগারিতার একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু কী সেই পুরস্কার! যে পুরস্কারটি
আল্লাহ নিজে দিবেন? পুরস্কার ব্যাপারে একটি রাছুল (ছা) হাদিসে বলেছেন- ‘রোজাদার ব্যক্তির দুটি আনন্দ। একটি হলো
ইফতারের মুহূর্তে আরেকটি তার প্রতিপালকের সাক্ষাতের মুহূর্তে (মুসলিম: ২৫৭৪
এবং ২৫৯৮ ই.ফা.)।’ এ হিসাবে সারা জীবন নফসে আম্মারার (কুপ্রবৃত্তি)
বিরোদ্ধে থেকে নফসে মুৎমাইনা(প্রশান্ত চিত্ত প্রাণ)তে বলবৎ থাকাই সিয়ামের সফল সাধনা।
যার প্রকৃত পুরস্কার সূখময় মৃত্যু যাকে আধ্যত্মিকতার পরিভাষায় ‘ইফতার’ বলা হয়েছে
ও আর ২য় পুরস্কারটি হলো প্রতিপালকের সাক্ষাত বা সন্দর্শনই ইহকাল-পরকালের পরম কাম্য।
যেহেতেু আধ্যাত্মিক মতে হাকিকতের রোজা সারা জীবনই যা নফসে আম্বারার বিরোদ্ধে। রমজান
মাসের সিয়াম সাধনাগুলো বাকি ১১ মাস বাস্তবায়ন রাখাই হাকিকতের রোজার সাধনা। আর যেকোনো
সাধনা শুরু করাটা কঠিন, অভ্যাস হয়ে গেলে সহজ।
বাংলাদেশে উয়ায়েছী তরিকার প্রতিষ্ঠাবর্গের
অন্যতম শাহ্ আব্দুর রহিম (রহ.) তার ‘মহম্মদী বেদ তত্ত্ব’ কিতাবে প্রায়
২০০ বছর আগে লিখেছেনÑ
“রোজাদার হয় মেরা নফছ আম্বারার।
বদ ফেল যত কিছু খোরাক যাহার।
ইফতারের কাল বটে আখেরী সময়।
এ ছুরাতে হয় রোযা রমযান আদায়।”
অর্থ- নফস= প্রাণ, প্রবৃত্তি। নফসে আম্বারা
= কুপ্রবৃত্তি, খারাপ কাজ। ফেল= কাজ।
রোজার সাহরি ও ইফতারের সময় সুর্নিদিষ্ট
করে দেওয়া সত্ত্বেও অনেকেই তা ঠিকমত পালন করছি কিনা ভাবার বিষয়। পবিত্র কুরআনে বলা
হয়েছে : ‘তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা থেকে উষার শুভ্ররেখা স্পষ্টরূপে
প্রতিভাত না হয়। অতঃপর রাত্রি পর্যন্ত রোজা পালন করো (২:১৮৭)।’ মাগরিবের আজান দিলেই ইফতার করতে হবে এমন কোনো কথা
নেই। পবিত্র কুরআন মাজিদের সরল অর্থ সম্বলিত দলিলই মুখ্য। আল্লাহ উক্ত আয়াতে ‘লাইল’ শব্দটি উল্লেখ
করেছেন। এই লাইল দ্বারা সন্ধ্যা বা সূর্যাস্ত বুঝায় না। সন্ধ্যা বা সূর্যাস্ত সময়কে
আরবিতে ‘শাফক’ বলা হয়। কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তোমরা রাত্রি পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ
করো। রাসুল (ছা.) এর হাদিস- (পূর্বদিকে হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন : যখন তোমরা ওদিক
থেকে রাত্রি নেমে আসতে দেখবে তখন সওমকারী ইফতার করবে (বুখারি- ৪৮০২ ই.ফা.)। আরেকটি
হাদিসÑ উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন : রাসুল (সা.) বলেছেনÑ যখন রাত আসে দিন চলে যায় এবং
সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন সিয়াম পালনকারী ইফতার করবে। (সহি মুসলিম, ই.ফা. ২৪২৫)। উল্লেখ্য,
জলদি ইফতার করারও হাদিস রয়েছে। তার মানে এই নয় যে, ইফতারের সময় হওয়ার আগেই ইফতার করতে
হবে। তাড়াতাড়ি ইফতার করা দ্বারা বুঝানো হয়েছে ইফতারের সময় হলে দেরি না করে জলদি ইফতার
করা। হাদিসে রয়েছে রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা
মাগরিবের সালাত আদায় করে ইফতার করেছেন। দেখুন
হাদিস “মুয়াত্তা ইমাম মালিক ৬২৪ নং এ বলা হয়েছে- “হুমায়দ ইবনু আবদুর রহমান (র) থেকে বর্ণিতঃ
উমার ইবনু খাত্তাব (রা) এবং উসমান ইবনু আফফান (রা) দু’জনে
মাগরিবের নামায আদায় করতেন, এমন সময় তখন তাঁরা রাত্রির অন্ধকার দেখতে পেতেন। (আর এটা
হত) ইফতার করার পূর্বে। অতঃপর তাঁরা (দু’জনে) ইফতার
করতেন। আর এটা হতো রমযান মাসে।”
আবারও স্মরণীয় যে, সারা জীবন কলুষমুক্ত
রাখাই রমজান মাসের শিক্ষা। আল্লাহর অলিদের কথা হলোÑ ‘মোমেনের সকল স্থানই মসজিদ, সকল দিনই শুক্রবার,
সকল মাস রমজান। সঠিকভাবে রোজা পালন না করতে পারলে কলুষমুক্ত হওয়া যায় না। কদর রাত্রির
উপলব্ধিও করা যায় না। আরও উপলব্ধি করা যায় না কুরআন নাজিল পদ্ধতি এবং রুহ, ফেরেশতা
অবতরণ প্রত্যক্ষ করা যায় না। শান্তির রাত্রিতে শান্তি পরিলক্ষিত হয় না। আল্লাহ যেমন
সত্য ও বাস্তব তেমনি কদরের রাত্রিও সত্য ও বাস্তব। এ বিষয়ে অনুমানই অজ্ঞতা ও ভুল। অজ্ঞতাই
কলুষমুক্ত হওয়ার পথে বড় বাধা। আর অজ্ঞতা দূর করার জন্য কারো নিকট সঠিক জ্ঞান অর্জন
করার অনিহা হলো অহংকার।
‘অভাবে স্বভাব নষ্ট প্রকাশ জাহানে;
জ্ঞানহীন থাকা ভবে অভাবের মানে।’
-হযরত শাহ্ কছিমুদ্দিন উয়ায়েছী (রহ.)
শবে কদর প্রতিটি মানুষের জীবনে পার হয়ে
যায়। যে সব জ্ঞানী ব্যক্তি এ রাত্রির অনুসন্ধান প্রক্রিয়া জানেন তাদের থেকে এ রাত্রির
সন্ধান জানতে হয়। সঠিক সাধনা জেনে নেয়া ছাড়া কদর রাত্রি খোঁজা মানে অথৈই সমূদ্রে মনি-মুক্ত
খোঁজার মত। আর সমূদ্রে মনি-মুক্তার সন্ধান জানা লোকের মাধ্যমে খুঁজা অধিকতর শ্রেয়।
কেননা আল্লাহ বলেনÑ ‘বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান? (৩৯:৯)।
এই লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- সঠিক সময়ে
রোজা পালন করে নিজেকে কুলষমুক্ত ও কদর রাত্রির সন্ধান যারা জানে তাদের মাধ্যমে কদর
রাত্রির দেখার সন্ধান জেনে জীবনে একবার হলেও কদর রাত্রী বাস্তব লাভ করে জীবন ধন্য করা
উচিত। এখনই তৎপর হউন অহংকারমুক্ত হয়ে বিষয়গুলি সন্ধান লাভ করুন।
পরিশেষে, রাসূল ও তাঁর আহলে বায়েতের শিক্ষার
ধারার মাধ্যমে তন ও মন পবিত্রের সাওম সাধনা, কদর রাত্রির সন্ধান রোজাদারের তাকওয়া হউক।
আমিন।





